ইব্রাহীম নগর

Raisul Mushfeq Siddiki

আমার নানুর বাড়িতে এই ঈদ উল আযহা-তে ঈদ উদযাপন করতে গিয়েছিলাম। আমিও বগুড়াতে থাকি আর নানুর বাড়িও বগুড়াতে হওয়ায় বেশি ভাগ ঈদ এখানেই পালন করি। নানুর বাড়িতে আমাদের পাড়ার ঈদগাহ মাঠ গ্রাম থেকে অনেক কাছেই। ঈদগাহ মাঠের আশেপাশর এলাকাকে মাঠপাড়া নাম দেওয়া হয়েছিলো। এইবার ঈদে সেই নাম পরিবর্তন করে মাঠের প্রতিষ্ঠাতা ইব্রাহিম মন্ডল এর নাম অনুসারে জায়গাটির নাম দেওয়া হয়েছে ইব্রাহিম নগর। কিছুদিন পর হটাৎ আমার মামা এসে আমাকে বলল ইব্রাহিম নগর সম্পর্কে আমি “ফেসবুকে” এখনও কিছু দিয়েছি কি-না? (এইখানে মামা ইন্টারনেটের বদলে সম্ভবত ফেসবুক কথাটা ব্যাবহার করেছে।) যাইহোক আমি এখনও কিছু লিখিনি শুনে সে বেশ অবাক হলো আর আমাকে ফেসবুকে “ইব্রাহিম নগর” ছড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলো আর বলল যে এসব করতে কোনো টাকা লাগে কি-না? তখন বলেছিলাম লাগে না কিন্তু এখন ভাবছি ওই সুযোগে আমার কিপ্টে মামার কাছ থেকে কিছু টাকা বাগানো যেতো... :(
ইব্রাহিম নগর প্রতিষ্ঠার দিন রেজা নানা নিজ খরচে সবাইকে ২টি করে লিফলেট জাতীয় কাগজ ধরিয়ে দিলেন যাতে ইব্রাহিম মন্ডল(মাঠের প্রতিষ্ঠাতা) সম্পর্কে অনেক কিছু লেখা আছে। আর এই ইব্রাহিম মন্ডল আমার নানাভাই মোজাফফর রহমান এর দাদা! আমি সেই কাগজ দুটোর লেখা গুলোই এখানে হুবহু তুলে ধরলাম তাহলে সম্ভবত আর আলাদা করে কিছু না বললেও চলবে।

. ঘোষণা পত্র
প্রিয় এলাকাবাসী,
আসসালামুআলাইকুম, আমরা আল্লাহর রহমতে বহু বছর ধরে শ্যামবাড়ীয়া ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করে আসছি। ভবিশ্যতে আমাদের পরবর্তী বংশধরেরা বংশপরমপরায় এই মাঠে নামাজ আদায় করবে; তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমরা সবাই একদিন মারা যাব। কিন্তু পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত এই মাঠের অবস্থান এখানেই রবে। আমরা জানি, এই মাঠের প্রতিষ্ঠাতা মহল হলো শ্যামবাড়ীয়া মন্ডল বাড়ি। কিন্তু এই মাঠের মূল প্রতিষ্ঠাতা হলেন, প্রয়াত ইব্রাহিম মন্ডল, পিতা নাসির উদ্দিন মন্ডল। তিনি ছিলেন বৃটিশ শাসন বিরোধী “ইসলামী ওহাবী” আন্দোলনের সগ্রামী নেতা। তিনি আমাদের সকলকে একত্রে নামাজ আদায়ের এক সুন্দর ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন। আমরা সবাই তার প্রতি চির কৃতজ্ঞ। আমাদের শুধু কৃতজ্ঞ থাকলেই চলবে না, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আমাদের করা উচিত। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই মহান ব্যাক্তির নাম আমাদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আর যদি আমরা তা না পারি, তাহলে আমরা যখন এই পৃথিবীতে থাকব না- তখন এই ব্যাক্তির নাম কেউ কোনদিন জানতেও পারবে না! সবাই একদিন এই মাঠের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিপ্লবী নেতা ইব্রাহিম মন্ডলকে ভুলে যাবে। তাই আজ আমাদের তার নাম ভবিশ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। আর তা যদি না পারি, তাহলে তা হবে আমাদের চরম ব্যার্থতা। এই ভালো মানুষটির নাম যাতে ভবিষ্যতে সবাই জানতে পারে- তার ব্যাবস্থা করা কিন্তু আমাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পরে বলে আমি মনে করি।
আর ঠিক তাই এই লক্ষ্যে গ্রামবাসী তার নাম ভবিশ্যতে সবাই যাতে নিতে পারে, এ বিষয়ে এক সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছেন। তারা তাঁর নামে শ্যামবাড়ীয়া বাইপাস রোড থেকে মাঠ পাড়া পর্যন্ত এলাকা 'ইব্রাহিম নগর' নামকরন করেছেন। এখন থেকে উক্ত এলাকা আপনারা অনুগ্রহ করে ইব্রাহিম নগর বলে আখ্যায়িত করে তাকে চিরস্বরণীয় করে বাধিত করবেন।
পরিশেষে, আজ আমি এই ঈদের মাঠে আনন্দমুখর পরিবেশে এই এলাকাকে ইব্রাহিম নগর হিসাবে ঘোষনা দিলাম। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি।
গ্রামবাসীর পক্ষে,
মোকছেদুর রহমান রেজা
সভাপতি
ইব্রাহিম মন্ডল স্মৃতি রক্ষা ও উন্নয়ন সংঘ,
শ্যামবাড়ীয়া

. বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তুাবিদ, সমাজ সেবক ও বিপ্লবী নেতা প্রয়াত হযরত ইব্রাহিম মন্ডলের স্মরনে
জনাব / প্রিয় এলাকাবাসী
আসসালামুআলাইকুম।
আপনারা জানেন "ওহাবী আন্দোলন” একটি বৃটিশ শাসন বিরোধী ইসলামী আন্দোলন, যাহা এই দেশে শুরু হয়েছিল বহু বৎসর আগে ১৯২১ সালের খেলাফত আন্দোলনের পূর্বে। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করা এবং সঠিক ভাবে ইসলাম ধর্ম প্রচার করা। এই আন্দোলন করতে গিয়ে সোন্দাবাড়ী গ্রামের তালুকদার আল মোহাম্মদ সরকার সাহেবের নেতৃত্বে বগুড়ায় অনেক নেতা জেলজুলুম ভোগসহ শাহাদত বরণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে এমনই একজন অন্যতম জেলজুলুম ভোগকারী নির্ভিক ইসলামি চিন্তুবিদ হলেন শ্যামবাড়ীয়া গ্রামের মৃত নাসির উদ্দিন মন্ডল সাহেবের পুত্র হযরত ইব্রাহিম মন্ডল সাহেব। তিনি যে ওহাবী আন্দোলনের নেতা ছিলেন তা সামসুদ্দিন তরফদার এর লিখিত পুস্তক “দুই শতাব্দির বুকে” ইব্রাহিম মন্ডল সাহেবের নাম লিপিবদ্ধ আছে। তিনি ও তার স্ত্রী ময়মন নেছা উভয়েই অত্র অঞ্চলের উদার মনের অধিকারী ছিলেন এবং সম্ভ্রান্ত ও বৃহৎ জোতদার পরিবারের সদস্য ছিলেন। তিনি (ইব্রাহীম মন্ডল) লোকদের ইবাদত বন্দেগীর জন্য নিজের জমি দান করে একটি ঈদগাহ মাঠ ও মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন যাহা আজও বিদ্যমান। শ্যামবাড়ীয়ার মসজিদটি এককালে অত্র এলাকার বেশ ক‌য়েক গ্রামের লোকদের নামাজ পড়ার জন্য একমাত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হতো। এছাড়াও তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পুকুর খনন, পানীয় জলের জন্য ইন্দারা স্থাপনের ব্যাবস্থা করে সমাজ সেবায় বিরল নজির স্থাপন করেছেন। গ্রামের অধিকাংশ রাস্তা তাঁর জমির উপর দিয়ে নির্মিত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে সুদূর মধ্য প্রাচ্য থেকে অনেক বিপ্লবী নেতা আত্মগোপনের জন্য তরবারী সহ তার কাছে আসতেন। ঐসব তরবারী মন্ডল বাড়ীর আশেপাশে কোথাও লুকায়িত অবস্থায় আছে বলে অনুমান করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে আরও জানা যায় হযরত ইব্রাহীম মন্ডল বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের “মধ্যমনি” হিসাবে পরিগণিত হতেন। তার চারিত্রিক গুনাবলির জন্য সবাই তাকে সম্মান স্বরূপ “হযরত” উপাধী দিয়েছিলেন, সবাই তাকে হযরত ইব্রাহিম বলে সম্বোধন করতেন। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় এই যে এমনি একজন সমাজসেবক ইসলামী চিন্তাবিদকে আজ আমরা ভুলতে বসেছি। ভেবে দেখুন আমরা যদি আজ তার কথা মনে না রাখি, তাহলে একজন ভালো মানুষকে কিভাবে মুল্যায়ন করব? তাই আসুন একটু খানি হলেও তাকে মুল্যায়ন করার চেষ্টা করি। মুল্যায়ন স্বরূপ প্রয়াত এই হযরত ইব্রাহিম মন্ডলের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য তাহার নামে একটি গেট সহ নামকরনের ব্যাবস্থা করা এলাকাবাসীর নৈতিক দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। তাই আসুন আমরা এই মহান নেতাকে স্বরণ করি।
স্মৃতি রক্ষার জন্য এই লেখা নিজে পড়ুন, অপরকে পড়তে উৎসাহি করুন।
প্রচারে
ইব্রাহীম মন্ডল স্মৃতি রক্ষা
কমিটির সকল সদস্যবৃন্দ
গ্রাম- শ্যামবাড়ীয়া ২য় বাইপাস রোড, বগুড়া

About the Author

Raisul Mushfeq Siddiki / Author & Editor

I am currently a student. Living in Bangladesh

0 টি মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন